পিতা-মাতার ভরন-পোষণ আইন, বাস্তবায়ন ও করনীয়:

সময়ের সাথে সাথে পিতা মাতার ভরন-পোষন আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি ছিল। আমাদের সমাজে পিতা-মাতার প্রতি অবিচার ও তাদেরকে ভরন-পোষন না দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। সচেতন সমাজ এই বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলেও পরিস্থিতি পিতা-মাতার ভরন-পোষনের অনুকুলে নেই বললেই চলে। আমাদের সমাজে এই সম্পর্কিত ব্যাপক ঘটনা দেখা যায়। অনেক আগে অনলাইন পত্রিকায় একটি লেখা পড়েছি। লেখাটি ছিল-

“একজন বৃদ্ধ একটি মসজিদের সামনে শুয়ে আছে। তাকে অনেক অসুস্থ মনে হল। ঐ ব্যক্তি এতই অসুস্থ ছিল যে, সে নিজে উঠতে পারছিলনা। স্থানীয় লোকজন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। ঐ বৃদ্ধের ছেলের নাম্বার নিয়ে ফোন করা হল কিন্তু সে ব্যস্ত বলে ফোন কেটে দিল। লেখক লিখেছেন উক্ত বৃদ্ধের দুই সন্তান ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। যাই হোক ঐ বৃদ্ধকে সর্বশেষ বাঁচানো যায়নি। কয়েকদিন চিকিৎসা শেষে মারা যান। তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার সন্তানদের ফোন করা হলে তারা লাশটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে দান করার জন্য বলে। বাবাকে শেষ বারের মতও দেখতে আসেনি” এই ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মাতা-পিতার কে কতটা কষ্ট দেওয়া হচ্ছে এবং তারা কতটা বঞ্চণার শিকার হচ্ছেন।
পিতা-মাতাকে প্রাধান্য, শ্রদ্ধা ও সেবা-যত্ন করার ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া আছে। আল্লাহ বলেন : তোমার পালনকর্তা আদেশ করছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবনদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উহ! শব্দটিও বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল। তাদের সামনে ভালবাসার সাথে নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল, হে পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশককালে লালন-পালন কবেছে। – (বনী ইসরাঈল-২৩-২৪)
অর্থ্যাৎ পিতা-মাতার সাথে নম্র আচরণ করা, সেবা-যত্ন করা। তারা বার্ধক্যে উপনীত হলে কোন রুঢ় কথা না বলা । এবং ধমক না দেওয়া। তাদের সে ভাবে সেবা-যত করা উচিত যেভাবে তারা শৈশবকালে তোমার সেবা-যত করেছেন। তোমার স্মরণ রাখা উচিত, প্রথমে তারা নিঃস্বার্থভাবে তোমার সেবা-যত্ন করে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। এখন তাদের যত্ন নিলেও তুমি তাদের সমকক্ষ হতে পারবেনা। কারণ শৈশবে তারা নানা যন্তনা ভোগ করেও সেবা-যত্ন করে তোমার দীর্ঘ জীবন ও সুস্থতা কামনা করেছেন। পক্ষাত্তরে বৃদ্ধ পিতামাতার কাছ থেকে একটু কষ্ট পেলে বা বকাঝকা শুনলেই তুমি তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যাও। পেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, পিতা-মাতা কে ছেড়ে একা থাকা। পিতা-মাতার ভরন-পোষণ না করা এখন প্রায়ই দেখা যায়। পিতা মাতার ভরন পোষন নিশ্চিত করার জন্য সরকার ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরন পোষন আইনটি পাশ করেন।

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন:
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন একটি জনকল্যাণকর আইন। এ আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যেহেতু সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয় সেহেতু আইনটি প্রণয়ন করা হলো। অর্থাৎ কোনো সন্তান যদি পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করে তাহলে তারা ভরণ-পোষণের জন্য এ আইনের অধীনে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায় করতে পারবেন। মা-বাবার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৩ ধারায় বলা হয়, প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মা-বাবার একাধিক সন্তান থাকলে সে ক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে। এ আইনের ৩ ধারায় আরো বলা হয়, কোনো সন্তান তার বাবা বা মাকে অথবা উভয়কে তার বা ক্ষেত্রমতো তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। তা ছাড়া সন্তান তার মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে। আইনে বলা হয়, কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে বা নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেয় তাহলে তারাও একই অপরাধে অপরাধী হবে। ফলে তারাও একই শাস্তির মুখোমুখি হবে। এ আইনের মাধ্যমে বাবার অবর্তমানে দাদা-দাদি এবং মায়ের অবর্তমানে নানা-নানিরও ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

মা-বাবা ছাড়া আরো যারা ভরণ-পোষণ পাবেনঃ
মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩-এর ৪ ধারা অনুযায়ী, মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ আইন অনুযায়ী দাদা-দাদি, নানা-নানিকেও ভরণ-পোষণ দিতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে পিতা যদি বেঁচে থাকে তাহলে সন্তানকে দাদা-দাদির এবং মাতা বেঁচে থাকলে নানা-নানির ভরণ-পোষণ করতে হবে না। ভরণ-পোষণ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদান করতে আইনে বলা হয়েছে।

পরিমাণঃ
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনের ৩ এর (৭) অনুযায়ী, কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সহিত বসবাস না করিয়া পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেই ক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাহার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমতো, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমতে, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করিবে। অথবা মাসিক আয়ের কমপক্ষে দশ ভাগ পিতা-মাতার বরণ পোষণ করিবেন।

আইন অমান্যকারীর বিচারঃ
কোন ব্যক্তি পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন আমান্য করলে অপরাধের আমলযোগ্যতা, বিচার ও জামিন সংক্রান্ত বিধানের ৬ ও ৭ ধারায় বলা হয়েছে, এ ধরনের অপরাধ প্রথম শ্রেণীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। কোনো আদালত এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানরা বাবা বা মায়ের লিখিত অভিযোগ ছাড়া আমলে নেবে না।

আইন অমান্যকারীর শাস্তিঃ
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৫ ধারার (১) অনুযায়ী, যদি কোনো প্রবীণ তাঁর সন্তান ানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের ০১ (এক) লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদন্ডে বিধান রাখা হয়েছে।

আপোষ-নিষ্পত্তি:
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর আইনটিতে আপোষ-নিষ্পত্তির বিধান আলোচনা করা হয়েছে। অত্র আইনের ৮ ধারার (১) উপ-ধারা অনুযায়ী আদালত এই আইনের অধীন প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য সংশিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার, কিংবা ক্ষেত্রমত, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর, কিংবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করিতে পারিবে। (২) উপ-ধারা (১) এর অধীন কোন অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হইলে, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানীর সুযোগ প্রদান করিয়া, উহা নিষ্পত্তি করিবে এবং এইরূপে নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলিয়া গণ্য হইবে।

বাস্তবায়ন ও করনীয়:
একটি আইন বাস্তবায়নের জন্য সচেতনতা ব্যাপক ভুমিকা রাখে। সরকার যদি ব্যাপক ভাবে প্রচার করে এবং সরকারি ভাবে টিভি ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে সচেতনমূলক প্রচারনা করা হয় তাহলে আইনটি বাস্তবায়নে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

মো: মনিরুল ইসলাম রাহুল
লেখক, একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী।